Tuesday, July 13, 2021

ভাঙ্গুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সফল বাবা

আমরা কম-বেশি সবাই জীবনে সফল হতে চাই। সবাই চাই জীবনে ভালো কিছু করতে, বড় হতে, সবার কাছে সম্মান পেতে। প্রতিটি সফল মানুষের ব্যর্থতার গল্প আছে। একবারে কেউ সফল হয়নি। সফল উদ্যোক্তা, রাজনীতিবিদ, শিল্পী, লেখক, বিজ্ঞানী- যার কথাই বলুন না কেন, সবাইকে ব্যর্থতার কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে সফল হতে হয়েছে। যারা জীবনে সফল হয়েছেন, তাদের অনেক সাধনা করতে হয়েছে। অনেকে সফল হওয়ার পরও আবার ব্যর্থ হয়েছেন পুনরায় আবার চেষ্টা চালিয়ে আবার সাফল্য পেয়েছেন। অনেকে আবার ব্যর্থতার হাজারটা পথ পাড়ি দিয়ে এক হাজার এক তম বারের চেষ্টায় সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু তারা থেমে থাকেননি। যতবড় ব্যর্থতার সামনে এসে পড়েন না কেন কখনওই তারা কাজ করা বন্ধ করেননি। চলুন তাহলে জেনে নিই পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার সাফল্য পাওয়া  এক সংগ্রামী মানুষের কাহিনী। 



তিনি মোঃ সানোয়ার হোসেন খন্দকার, পিতা মৃতঃ এসহাক আলী খন্দকার, মাতা মৃতঃ নজেদান খাতুন। সাং বেতুয়ান, থানাঃ ভাঙ্গুরা, জেলাঃ পাবনা। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় ১০ এপ্রিল ১৯৬৩ সালে  জন্মগ্রহণ করেন । 


সানোয়ার হোসেন খন্দকার, আর দশজন মানুষের মত শারীরিকভাবে শক্তিশালী না হলেও ছোট বেলা থেকেই ছিলেন খুব তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ। যে কোন কাজ একবার দেখলেই তা সহজেই আয়ত্তে নিয়ে করতে পারতেন। লেখা পড়াতে প্রাইমারী স্কুলের গণ্ডি না পেরুলেও, আমরা দেখেছি ব্যবসা করতে গিয়ে খাতা কলমে হিসাব রাখতে তার সমস্যা হয়নি কখনও, বানান করে পড়তেও পারেন।


মাত্র ১৩/১৪ বছর বয়সে দর্জির ট্রেনিং শেষ করে ট্রেইলারিং ব্যবসা শুরু করেন, কাঁধে তুলে নেন বাবা-মা, ভাই-বোন সহ পুরা পরিবারের দায়িত্ব। নিজে পড়ালেখা না করতে পারার অতৃপ্তি থেকে পণ করেন পরিবারের অন্য সদস্যদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। আশির দশকে বিয়ে করেন বেতুয়ান নদী পাড়া দেলবার হোসেন খাঁনের কন্যা রুবিয়া খাতুন কে। দুজনার দর্জির কাজ কর্মেই চলতে থাকে সংসার। 

ব্যবসার প্রসারের সাথে সাথে সখ্যতা গরে ওঠে বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি), শেখানে তিনি ভাঙ্গুরা উপজেলার ডাইরেক্টর হিসেবেও নির্বাচিত হয়।  বড় ভাই নাজমুল হুদা কে সমবায়ের মাধ্যমে ইলেকট্রিক ট্রেনিং করাইয়া কর্মজীবী করে তোলেন। ছোট ভাই গোলাম মোস্তফা কে শিক্ষিত (বিএ পাশ) করান,তিনিও এখন বিআরডিবি তে চাকুরীরত। এছাড়াও তিনি নিজের এবং আশে পাশের গ্রামের অনেক বেকার যুবকের বিভিন্ন পেশায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের অনেকেই এখন সুপ্রতিষ্ঠিত।

 

সানোয়ার হোসেন সত্যি একজন প্রতিভাবান মানুষ, তিনি ১৯৮৯ইং সালে নিজ প্রতিভায় ব্যতিক্রম ধর্মী আট চাল বিশিষ্ট একটি টিনের ঘর নির্মাণ করেন। আশে পাশে অনেক জায়গায় ঘুরেছি কিন্তু এমন ঘর আর কোথাও চোখে পড়েনি। ব্যবসা ক্রমেই বড় হতে থাকে, বি বি স্কুল এন্ড কলেজ মার্কেটে বিশাল বড় সিট/শাড়ি কাপড়ের দোকান দিয়েছিলেন এবং পাশাপাশি করেছেন গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রামীণ-টেলিকমের মোবাইল কলের ব্যবসা, যা বেতুয়ান গ্রামের আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে দীর্ঘদিন। 


দীর্ঘদিন ব্যবসা করে, কৃষি চাষাবাদের দিকে ঝুঁকি নেন, এবং এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপনের জড়িত হয়,কয়েকটি প্রকল্পের অংশ নিয়ে ছিলেন, এছাড়াও পূর্বেও কৃষি পাওয়ার ট্রিলার, ও গাভী পালন করেছেন।  এর পরে চাষাবাদ ও গাভী  পালন ছেড়ে দিয়ে, দেশি/বিদেশী বয়লার ও লেয়ার মুরগীর খামার করলেন নিজ বাড়ীতে। দিন রাত হার ভাঙ্গা পরিশ্রম করেছেন পরিবারের সকল কে সুপ্রতিষ্ঠিত হিসাবে গড়ে তোলার জন্য। আজ সানোয়ার হোসেন খন্দকার একজন সফল অভিভাবক ও গর্বিত পিতা।


দুই সন্তান কে করেছেন শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। 

বড় ছেলেঃ মেহেদী হাসান (রাসেল), কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি, এমএসসি ডিগ্রী অর্জন করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার (নির্বাহী প্রকৌশলী) হিসেবে কর্মরত। পূর্বে সে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জরী কমিশনে) প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে  দীর্ঘদিন কাজ করার পরে প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার (ডেপুটি ম্যানেজার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।  চাকুরীকালে কর্মদক্ষতা ও সততার সহিত দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারিভাবে ইউরোপ এবং অ্যামেরিকাতে ইন্টারশীপের সুযোগ সহ বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান ছারাও  বিদেশি সংস্থার মাধ্যমেও বিভিন্ন প্রযুক্তি সম্মেলনে অংশগ্রহনের জন্য নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর সহ ১০টি দেশে ভ্রমণ করেছে।


কন্যাঃ সানমুন ইয়াসমিন (শাকিলা), কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিএসসি, সুনাম-ধন্য তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর সহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত আছে। 


ছোট ছেলেঃ ছোট বেলাতে ভূল চিকিৎসার শিকার হয়ে ব্রেইন ড্যামেজ হয়ে যায়। দীর্ঘ মেয়াদি চিকিৎসা দেওয়ার পরেও সুস্থ না হয়ে ১৮ বছর বয়সে চিকিৎসারত অবস্থাতেই মৃত্যুবরন করেন। 


সানোয়ার  ও তার স্ত্রী রুবিয়া খাতুন, এখন আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারেনা, তারা দুজনই শারীরিক ভাবে অসুস্থ। সানোয়ার খন্দকার এই বয়সে এসেও কোরান শরীফ পড়া শিখেছেন। এক বছর সানোয়ার  ঢাকায় ছেলের বাসায় ছিলেন,সেখান থেকে বাড়ীতে এসেই, তার সেই পূর্বের ভিন্ন ধর্মী ঘর ভেঙ্গে ফেলেন এবং নিজ প্রতিভায় তার একান্ত চিন্তাধারায় নতুন নকশায় বিল্ডিং নির্মাণের কাজ শুরু করেন। দুই একজন  সহকারী রাজমিস্ত্রি কে সাথে নিয়েই সম্পূর্ণ শেষ করছেন বিল্ডিং নির্মাণের কাজ।  এলাকাবাসী আশ্চর্য (অবাক) হয়ে দেখেছেন। শুধু তাই নয়, সানোয়ার  যৌবনকালে আশে পাশে দশ গ্রামের মধ্যে দর্জি কাজে খুবই সুনাম ছিলো।


দুর দূরান্ত থেকে লোকজন আসতো জামা কাপড় তৈরি করার জন্য। ঈদ আসলেই সারারাত ক্যাসেট বাজিয়ে গ্রামের যুবক ছেলেরা আড্ডা দিতো। প্রতি বছর দুইদিন ব্যাপী হালখাতা হতো, মনে হতো গ্রামে ঈদের আনন্দ হচ্ছে।  তিনি আজ একজন সফল অভিভাবক ও গর্বিত পিতা। 


শেয়ার করুন