Saturday, June 19, 2021

বাড়ছে করোনা, বড় বিপদের শঙ্কা : কোথাও স্বাস্থ্যবিধি নেই!

দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বর-সর্দির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ নমুনা পরীক্ষা করিয়ে করোনা পজিটিভ হয়েছে। তবে জনসংখ্যার অনুপাতে খুবই অল্পসংখ্যক মানুষের নমুনা পরীক্ষা হওয়ায় করোনার প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। এরই মধ্যে অনেক জায়গায় লকডাউনসহ বিভিন্ন বিধি-নিষেধ জারি করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা একেবারেই দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে কড়াকড়ি আরোপ হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্নশ্রেণির অনেক মানুষ।

কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপসহ নানা সিদ্ধান্তেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না খুলনার করোনা পরিস্থিতি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার জেলায় ২২৬ জন এবং বিভাগে এক হাজার ৩৩ নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। ফলে কভিড চিকিৎসা দেওয়া হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।

শুক্রবার ছুটির দিনে নগরীর একাধিক বাজার ও রাস্তায় ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মানুষই মাস্ক ব্যবহার করছে না। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণী, বয়স্ক মানুষ, দোকানের বিক্রেতা, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদাসীন। বয়স্ক ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে আক্রমণাত্মক জবাব দিচ্ছেন। তাঁরা বিষয়টি সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন। আবার নগর অভ্যন্তরে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক, সিএনজি, মাহিন্দ্রা, নন্দীসহ কোনো যানবাহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।



খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের শুক্রবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে বিভাগে ৪৩ হাজার ৬৪৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা গেছে ৭৭৫ জন, যার মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় আটজন। আক্রান্তের দিক দিয়ে শীর্ষে রয়েছে খুলনা জেলা, ১২ হাজার ৪৪৯ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত যশোরে ৯ হাজার ২৪৪, বাগেরহাটে দুই হাজার ৪৭৯, সাতক্ষীরায় দুই হাজার ৭৯৬, নড়াইলে দুই হাজার ২১০, মাগুরায় এক হাজার ৩৭৫, ঝিনাইদহে তিন হাজার ২৮২, কুষ্টিয়ায় ছয় হাজার ৬২, চুয়াডাঙ্গা দুই হাজার ৪৪৭ ও মেহেরপুরে এক হাজার ৩০০ জন। খুলনার পর বেশি মারা গেছে কুষ্টিয়ায় ১৪০, যশোরে ১০১, চুয়াডাঙ্গায় ৬৬, ঝিনাইদহে ৬১, বাগেরহাটে ৬৩, সাতক্ষীরায় ৫৬, নড়াইলে ৩০, মাগুরায় ২৪ ও মেহেরপুরে ৩১ জন।

খুলনা সিভিল সার্জনের দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে ২০৩ হয়েছে। আবার খুলনা জেলার মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যায় মহানগরী এগিয়ে। এখানে ৯ হাজার ৯৫৮ জন আক্রান্ত হয়েছে, মারা গেছে ১৪৯। সর্বনিম্ন আক্রান্ত হয়েছে কয়রা উপজেলায়। এই উপজেলায় এ পর্যন্ত ১০৭ জন আক্রান্ত ও মৃত্যুবরণ করেছে ছয়জন। এর পরে রয়েছে ফুলতলা উপজেলায় ৪৫৮, রূপসায় ৪৩৬, পাইকগাছায় ৩১৯, ডুমুরিয়ায় ৩০২, দাকোপে ২৯৫, দিঘলিয়ায় ২৫২, তেরখাদা ১৬৩ ও বটিয়াঘাটায় ১৬১ জন। মৃত্যুর সংখ্যায় জেলার দ্বিতীয় অবস্থানে রূপসায় ১৭ জন।

গত ৪ জুন ভোর থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটির এক সপ্তাহের জন্য খুলনার রূপসা উপজেলা, খুলনা সদর, সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুর থানায় কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করে, যা পরবর্তী

সময়ে বেড়ে এখনো চলমান রয়েছে। বিধি-নিষেধটিতে বলা হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান ও কাঁচাবাজার বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের বাধ্যতামূলকভাবে ন্যূনতম তিন ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ও মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে বেচাকেনা করতে হবে। সার্বক্ষণিক ওষুধের দোকান খোলা রাখা যাবে। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো পার্সেল অথবা প্যাকেটজাত খাবার সরবরাহ করতে পারবে। সন্ধ্যার পর কোনো রাস্তার মোড়ে বা স্থানে একাধিক ব্যক্তি অবস্থান করা বা একসঙ্গে চলাফেরা করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

জনউদ্যোগ খুলনার সদস্যসচিব মহেন্দ্র সেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা থেকে রেহাই পেতে হলে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। কিন্তু খুলনায় স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো লক্ষণ নেই। ন্যূনতম মাস্ক পরিধানের বিষয়টিও কেউ মানতে চায় না। আমরা সচেতনতামূলক কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছি। প্রশাসনের এ ক্ষেত্রে আরো তৎপর হতে হবে। না হলে সামনে বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।’

করোনা প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সমন্বয়কারী, খুলনা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘খুলনায় করোনা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিটি সভায় এ নিয়ে কথা বলছি। শুধু কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সম্মিলিতভাবে বিধি-নিষেধ, স্বাস্থ্যবিধি মানতে মানুষকে বাধ্য করতে হবে। জনপ্রতিনিধি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও প্রশাসনকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। না হলে শেষ রক্ষা করা কঠিন।’

টাঙ্গাইলে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৩৩৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৪৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তের হার ৪৩.২৮ শতাংশ। এ নিয়ে গতকাল শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত জেলায় মোট করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৯৭০ জন। জেলার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা টাঙ্গাইল সদর ও কালিহাতী উপজেলায়। নতুন আক্রান্তদের মধ্যে সদর উপজেলায় ৮২ জন ও কালিহাতী উপজেলায় ৩৪ জন রয়েছে। এ ছাড়া ধনবাড়ীতে ১৪ জন, মির্জাপুরে ৯ জন, সখীপুরে চারজন, ভূঞাপুরে দুজন রয়েছে। টাঙ্গাইল জেলায় গত বৃহস্পতিবার আক্রান্ত হয়েছে ১১৩ জন। এর মধ্যে টাঙ্গাইল সদরে ছিল ৫৪ জন ও কালিহাতীতে ছিল ২০ জন। জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মোট ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘এক মাস ধরে জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে এক সপ্তাহ যাবৎ ৩০ শতাংশ বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। আমরা কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছি। এ নিয়ে রবিবার এক সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে কঠোর লকডাউনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

গাজীপুরে করোনা রোগীর সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। গত ১০ দিনে জেলায় নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৪৬১ জন। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে দুই হাজার ৮৩৪ জনের। এর আগের ১০ দিনে জেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, করোনা বৃদ্ধি পেলেও ঝুঁকিতে নেই গাজীপুর।

গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতলের আবাসিক চিকিৎসক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ১০ দিন ধরে রোগীর চাপ একটু বেশি। আগে করোনা ওয়ার্ডে মাত্র এক-দুজন রোগী ভর্তি ছিল। এখন সংক্রমণ একটু ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গতকাল শুক্রবার করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ছিল ১২ জন। তার মধ্যে সংকটাপন্ন তিনজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। তা ছাড়া করোনা আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে তিনজন।

গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. খায়রুজ্জামান জানান, কয়েক দিন ধরে করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা সামান্য। গাজীপুরের পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটা ভালো। এ পর্যন্ত কোনো রোগীর দেহে ভারতীয় ধরন মেলেনি। আইডিসিআরের প্রতিবেদন ও তালিকায় গাজীপুর জেলা ঝুঁকিমুক্ত।

যশোরের বেনাপোল পোর্ট থানা ও শার্শা উপজেলায় হু হু করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। সংক্রমণ ঠেকাতে সেখানে লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন। কিন্তু বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা করছে না সাধারণ মানুষ। চলছে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, ইজি বাইক ও প্রাইভেট কার।

এদিকে ভারত থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে দেশে আসা পাসপোর্ট যাত্রীদের ১৪ দিন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনের রাখাসহ খাবার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিতরণ করেছে প্রশাসন। ভারত থেকে প্রতিদিন বাংলাদেশে আসছে পাসপোর্ট যাত্রী। ভারত থেকে আসা যাত্রীদের স্থানীয় হোটেলে নিয়ে রাখা হচ্ছে। বেনাপোল শহরের বিভিন্ন জায়গায় উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, আনসার ও পৌর পুলিশ মানুষকে সচেতন করতে দিন-রাত কাজ করছে। এর পরও স্বাস্থ্যবিধি ও সরকারের দেওয়া নির্দেশনা মানতে রাজি না এ অঞ্চলের মানুষ। বেনাপোল পোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ মামুন খান বলেন, ‘বেনাপোল বাজারের সব দোকানদারকে বলা হয়েছে মাস্ক পরিধান ছাড়া কোনো কিছুই বিক্রি করবেন না। করোনা প্রতিরোধ কমিটির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। ভারত থেকে আসা যাত্রীদের মাস্ক এবং স্যানিটাইজার দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে বিভিন্ন হোটেলে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করছি। আসলে সাধারণ মানুষ যদি সচেতন না হয় তাহলে পুলিশের একার পক্ষে কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব?’

গোপালগঞ্জ পৌর এলাকা, লতিফপুর ইউনিয়ন, মুকসুদপুর উপজেলা সদর এবং কাশিয়ানী উপজেলা সদরে কাশিয়ানী ইউনিয়নে সাত দিনের বিশেষ লকডাউনের প্রথম দিন ছিল গতকাল শুক্রবার। লকডাউন সাধারণ মানুষকে মানতে ও সচেতন করতে বিভিন্ন স্থানে তৎপরতা দেখা গেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। জেলা তথ্য অফিস থেকে করা হচ্ছে মাইকিং। কিন্তু বিধি-নিষেধ পালনে অনেকটা শিথিলতা দেখা গেছে। কিছু দোকানপাট বন্ধ থাকলেও বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছিল খোলা। বেশির ভাগ মানুষকে মাস্ক না পরে বাইরে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। প্রশাসনের তরফেও শক্ত অবস্থান ছিল না। সকালের দিকে পুলিশ সড়কে বা মার্কেটে থাকলেও বিকেলে দেখা যায়নি।

গত ২৪ ঘণ্টায় গোপালগঞ্জে ১৪৮টি নমুনা পরীক্ষায় ৩৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে লকডাউন এলাকা গোপালগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৫ জন ও শহরসংলগ্ন লতিফপুর ইউনিয়নে দুজন এবং কাশিয়ানী ইউনিয়নে দুজন শনাক্ত হয়। এ নিয়ে গোপালগঞ্জ পৌর এলাকায় গত দুই সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭ জনে।


শেয়ার করুন