Thursday, February 11, 2021

ভাঙ্গুড়ায় সুই-সুতায় ভাগ্য ফেরানো সাথী শ্রেষ্ঠ জয়িতা | ভাঙ্গুড়ার আলো

বিশেষ প্রতিনিধি

ছোটবেলা থেকেই সুই-সুতার কাজে খুবই আগ্রহী ছিলেন সুমনা সুলতানা সাথী। দর্জি শিক্ষায় পারদর্শী মায়ের কাছ থেকে হাতে কলমে কাজ শিখে কাপড়ের বিভিন্ন পণ্য তৈরি করায় হয়ে ওঠেন সুদক্ষ। এরপর ২০০২ সালে স্থানীয় কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে (স্নাতক) দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন পরিবারের অমতে প্রতিবেশী যুবক মনোয়ার হোসেন রানাকে বিয়ে করেন। এতে পরিবারের সবার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয় তার। বেকার স্বামীর টানাটানির সংসারে নিজের পড়ার খরচ সংসারের খরচে দিশেহারা অবস্থা তার। তখনই মায়ের শেখানো সুই-সুতা হাতে নিয়ে কাপড়ের চারটি কুশন কাভার বানিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পাঠালেন আড়ংয়ে। দুটি কাভার পছন্দ হওয়ায় আড়ং ৮০টি কুশন কাভার তৈরির অর্ডার দিলেন সাথীকে। কিন্তু পুঁজি সংকটে ভেঙে পড়েন সাথী। তখন স্বামী রানা শখের পায়রা বেঁচে কুশন কাভার তৈরির জন্য টাকার যোগান দেন। নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করার আড়ং প্রথম মাসেই ৮০ হাজার টাকার কাজের অর্ডার দেয় সাথীকে। দুই কর্মী নিয়ে সেই অর্ডার সময় মত শেষ করেন।

এরপর থেকে সাথী নিয়মিত কাজের অর্ডার পেতেন। পাশাপাশি সাথী পাবনায় স্নাতক ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। দিনে দিনে অর্ডারের পরিমাণ বেড়ে ভাগ্য বদলাতে থাকে অজো পাড়াগাঁয়ের এই গৃহবধূর। সুদক্ষ হাতে গত ১৭ বছরে গড়ে তুলেছেন বৃহৎ বুনন শিল্প। অর্জনের স্বীকৃতি স্বরূপ দেড় বছর আগে পান বর্ষসেরা জাতীয় এসএমই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার। জীবন সংগ্রামে হার না মানা এই নারী এবার রাজশাহী বিভাগের অর্থনৈতিক ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হলেন। এছাড়া শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ক্ষুদ্র শিল্পে অনন্য অর্জনে 'ন্যাশনাল প্রডাক্টিভিটি অ্যান্ড কোয়ালিটি এক্সিলেন্ট' (এনপিও) অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। সুমনা সুলতানা সাথী (৩৮) পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পাটুলিপাড়া গ্রামের মনোয়ার হোসেন রানার স্ত্রী।

জানা যায়, সাথীর আয়ে গ্রামের বাড়িতে দোতলা ভবন নির্মিত হয়। সেখানে নিচ তলায়এসআর হ্যান্ডিক্র্যাফটসনামে কাপড়ের তৈরি পণ্য সামগ্রীর কারখানা করা হয় এবং দোতালায় তারা বসবাস করেন।  পরে ব্যবসায়িক প্রসারের কারণে পাবনা শহরে আরেকটি কারখানা করেন। সবশেষে শহরের লতিফ টাওয়ারে 'ভিলেজ' নামে একটি ফ্যাশন হাউস উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে ৩২ জন নারী অফিশিয়ালি কাজ করছেন। এছাড়া ভাঙ্গুড়া আশেপাশের উপজেলা সহ  সাতক্ষীরা, রাজশাহী যশোর নাটোর অঞ্চলের ৬০০ এর অধিক নারী মজুরির ভিত্তিতে কুশন কাভার, সোফার কাভার, নকশিকাঁথা, বিভিন্ন নকশার বিছানার চাদর পর্দা, টেবিল ক্লথ, মেয়েদের কুর্তি, ছেলেদের ফতুয়া, পাঞ্জাবি শিশুদের নানা পোশাক তৈরি করে সাথীর প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে। এখন প্রতি মাসে আড়ং-সহ তিনটি স্বনামধন্য ফ্যাশন হাউজ থেকে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকার কাজের অর্ডার পায় তার প্রতিষ্ঠান। সাথী তার স্বামী রানা মিলে ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তাদের প্রতিষ্ঠানের পণ্য আড়ং, অঞ্জন, স্মার্টেজ লারিকসহ খ্যাতনামা কয়েকটি ফ্যাশন হাউজ বিক্রি হয়।

সাথীর স্বামী মনোয়ার হোসেন রানা বলেন, বেকারত্বের কারণে সাথীকে বড় ধরনের আর্থিক সহযোগিতা দিতে পারিনি। ধার-দেনা করে শখের পায়রা বিক্রি করে কিঞ্চিত অর্থ সাথীকে দিয়েছি। তবে সাথীর কাজে দক্ষতা দেখে সবসময় মনে হয়েছে ওকে দিয়ে ভালো কিছু হবে। তাই আশাহত না হয়ে উৎসাহ সাহস যুগিয়েছি। এতে আজকের এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ক্ষুদ্র শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী সুমনা সুলতানা সাথী বলেন, শূন্য থেকে জীবন শুরু করেছিলাম। সে সময় পরিবারের কাউকে পাশে না পেয়ে হতাশায় দিন কেটেছে। তবে থেমে থাকিনি। মায়ের শেখানো সুই-সুতার  কাজে দিনরাত পরিশ্রম করে ভাগ্যের বদল ঘটিয়েছে। সব সময় আমার স্বামী পাশে থেকে সাহস যুগিয়েছেন সহযোগিতা করেছেন। এখন আমার লক্ষ্য ফ্যাশন হাউজটি আরো বৃহৎ পরিসরে এগিয়ে নেওয়া এবং পাশাপাশি ঝুট লেদারের পণ্য তৈরির কাজ শুরু করা।


শেয়ার করুন