Thursday, June 4, 2020

ঈশ্বরদী-ঢাকা রুটে বাওনজান রেল সেতুর কল্প কথা



                            নীল নবঘনে আষাঢ়গগণে তিল ঠাঁই আর নাহিরে ।
                                 ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে ।।

(সংগ্রহিত)
কবি গুরুর এই অমর কবিতাখানি আর আজকের লেখার বিষয়বস্তুর দৃশ্যপট একেবারে মন ছুঁয়ে যায়। আকাশে কালো মেঘ এমন লগ্নে বিলের মধ্যে রেল লাইনের উপর দিয়ে ছুটে আসছে দ্রুতগামী সব আন্তনগর ট্রেন। নিচে বন্যার পানিতে ফুঁসে ওঠা বিল আর উপরে খাচা ছাড়া রেল লাইন। চোখ পড়তেই কেমন একটা অজানা ভয় মনকে ভীষণ নাড়া দেয়।

ঈশ্বরদী-ঢাকা অভিমুখি রেলপথের শরৎনগর স্টেশনের কৈডাঙ্গা ব্রিজ থেকে লাহিড়ী মোহনপুর পর্যন্ত পুরো লাইনটি চলনবিলের মাঝ দিয়ে অতিক্রম করেছে। বন্যার সময় রেল লাইনের দু’পাশে দূর থেকে বিলের ঢেউ আচড়ে পরে সড়কের গায়ে। এর পর আকাশের কালো মেঘ আর বর্ষণ যদি ধেয়ে আসে বিল তখন হিংস্র হয়ে ওঠে। এমন গোধুলি লগ্নে খাচাবিহীন ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন যখন দ্রæত বেগে ছুটে যায় তখন ভেতরটা মুচড়ে ওঠে।

রেলের এই রুটের দিলপাশার স্টেশনের নিকটবর্তী  বাওনজান এমনি একটি দীর্ঘাকারের ব্রিজ যার উপর কোনো খাচা নেই অথচ নিচে বিশাল দহ। ফলে ব্রিজ অতিক্রমের সময় ট্রেনের তলদেশ থেকে গুম গুম আর মেঘের গর্জনের মত ভয়ানক শব্দ হয়। অনেক পূর্বে এই ব্রিজের শব্দ ২০ থেকে ৩০ মাইল দূর পর্যন্ত শোনা যেত। গভীর রাতের ট্রেনগুলো যখন ব্রিজ পার হতো তখন দূর এবং কাছের লোকজন ঘরির সময় বুঝতে পারতেন।
এলাকার বয়জেষ্ঠ লোকজনের সাথে আলাপে জানাগেছে, ১৯১২- ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে এই রেলপথ তৈরি হয়। তখন বাওনজাানে একটি খরস্রোতা গুমানির একটি শাখা নদী প্রবাহিত ছিল। উপরন্ত ১৯৩৮ সালে প্রবল বন্যা আসে। বৃষ্টি আর বন্যা মিলে রেলপথ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনি এক রাতে বারটার দিকে ঈশ্বরদী গামী মেইল ট্রেন ব্রিজটি পার হবার সময় লাইনচ্যুত হয়ে ব্রিজের উপর থেকে দহের মধ্যে পড়ে যায়। তখন অনেক যাত্রীর প্রাণহানী ঘটে। এরপর থেকে এই দহ মানুষের কাছে আতংকের হয়ে ওঠে।

লোকমুখে কথিত ছিল যে,এখানে সে সময় অসংখ্য অতৃপ্ত আত্মার বসতি গড়ে ওঠে। এখনো প্রতিবছর এই ব্রিজের উপর দূর্টনায় ২/৩জন পথিকের মৃত্যু ঘটে বলে জানাযায়। এলাকার অন্তত দশ গ্রামের মানুষ এ পথে হেঁটে চলাচল করতে হতো। সন্ধ্যা হলেই নাকি এ পথের পথিকদের কাছে প্রেতাত্মারা এটা ওটা চাইতো। তাই সন্ধ্যার আগেই এ ব্রিজ যাতে পারি দেওয়া যায় সেভাবেই লোকজন চলাচল করতেন। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এখানকার দহের মাছ কেউ ধরেই সাহস পেত না। দহের একেকটি গজার বিশালাকারের ছিল। তার গায়ে সোনালী রংয়ের ডোরা চিহ্ন দেখলে অনেকেই ভয় পেতেন। এসব গজার মাছে নাকি প্রেতাত্মা থাকতো। ফলে গজার মাছ অনেকেই খেতেন না। এছাড়া বড় বড় বোয়াল,আইর যার এক একটির ওজন তিন থেকে চার মন পর্যন্ত ছিল। বাইম মাছের কথা শুনলে গা শিহরে ওঠে। বাঁশের মত মোটা আর তিন চার হাত লম্বা,গায়ের পুরু চামড়া হলুদ বর্ণের দেখা যেত। অনেকেই বাইম মাছও তখন খেতেন না। এসব মাছের সাথে নাকি দেও দৈত্যের একটা সম্পর্ক ছিল।

এখনো এই দহের মাছে নাকি অনেক স্বাদ। তবে এসব কল্প কথা আর শোনা যায়না।
কৈডাঙ্গা গ্রামের প্রায় ৮০ বছর বয়সের মৌলভী মোঃ আবুল কাশেম খান বলেন,আমার পিতা মরহুম আব্দুল জলিল খান এর কাছে বাওনজান ব্রিজের অনেক গল্প শুনেছি। ১৯৩৮ সালের ভয়াবহ ট্রেন দূর্ঘনাও তার কাছ থেকেই শোনা। তিনি আরো বলেন,১৯৮৫ সালে দিলপাশার দহের রেল ব্রিজের মুখে বট গাছ পড়ে থাকায় তখনও একটি ভয়াবহ দূর্ঘটনা ঘটে। এতেও বহু মানুষের প্রাণহানী ঘটে।

মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বলেন,যুদ্ধের সময়ও এখান দিয়ে লোকজন চলাচল করতে ভয় পেত। তবে যুদ্ধের পরে বাওনজানের দহের পাথরের ফাঁকে ফাঁকে শত শত বাইম মাছ থাকতো । বাঁশের ছিপের সাথে লম্বা সূতা আর বশসির সাথে খাদ্যের টোপ দিয়ে ফেললেই বড় বড় বাইম মাছ উঠে আসতো। এসবই আজ গল্প মনে হয় কিন্তু সে সময় সত্য ছিল।

বংকিরাট গ্রামের আবুল কালাম ও দিলপাশার গ্রামের সুশিল কুমার ঘোষ বাওনজান ও দিলপাশার দহের মাছের গল্প বলে শেষ করতে পারেননি। অবশ্য এই দুই দহের মাছ যারা এখনো খান তারাই কেবল এর স্বাদ আস্বাদন করতে পারেন।

শেয়ার করুন